ফোন এবং ব্রাঞ্চ ব্যাঙ্কিং – ICICI ব্যাঙ্ক, আমার অভিজ্ঞতা
Posted by Florence Ria চালু করুন 23/04/2009
আজকে লিখবো ফোন ব্যাঙ্কিং নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। আমি কোনোদিনই ফোন ব্যাঙ্কিং সুবিধা ব্যাবহার করিনি। একদিন হঠাৎই ইচ্ছা জাগলো যে দেখি ফোন করে, নাহয় একাউন্ট ব্যালান্স জানবো! যেই না ভাবা অমনি কাজ, Welcome To ICICI Bank Phone Banking, how may I help you? মিষ্টি কন্ঠে বলে ওঠা অপারেটর মহিলাকে জানালাম যে আমি আমার একাউন্ট ব্যালান্স জানতে চাইছি। সুমিষ্ট কন্ঠে তিনি জানতে যা চাইলেন তা হল আমার স্থায়ী ঠিকানা ও জন্ম তারিখ; উত্তরে আমি যা জানালাম, তাতেই বিপত্তির শুরু।
আমার জন্ম তারিখ মিলে গেলেও আমার স্থায়ী ঠিকানা মেলেনি। ওপারের মিষ্টি কন্ঠ একেবারেই গলে গিয়ে আমাকে জানালো যে “একটু মনে করে আপনার স্থায়ী ঠিকানাটা বলুন, আপনি যেটা বলেছেন সেটি আপনার অস্থায়ী ঠিকানা“। বলে কি? মনে করে বলুন মানে? আমি কি আমার স্থায়ী ঠিকানা ভুল বলতে পারি? এও কি সম্ভব? কিন্তু কি করা যাবে, ঠিকানা মেলেনি তাদের কম্প্যুটার রেকর্ডের সাথে। এবারে কথোপকথনের ধারা একটু বদলালো, আমি তাকে জানালাম যে আমার স্থায়ী ঠিকানা আর অস্থায়ী ঠিকানা দুটো একই, আলাদা নয়। ব্যাপারটি গোলযোগ আছে বুঝে অপারেটর আমাকে জানালো যে তাদের রেকর্ডে দুটি ভিন্ন ঠিকানা দেওয়া আছে। এবং, নিয়ম অনুযায়ী অপারেটর সেই ঠিকানা জানাতে না পারলেও তিনি আমাকে আভাস দিতে রাজি হলেন এবং জানালেন যে স্থায়ী ঠিকানাটি একটি অফিসের ঠিকানা। বুঝলাম পরিস্থিতি বড়ই বিপজ্জনক। কোনো একটি অজানা অফিসের ঠিকানা লেখা রয়েছে আমার স্থায়ী ঠিকানার স্থানে।
কি আর করা, অপারেটরের কাছে জানতে চাইলাম আপদকালীন যোগাযোগ ফোন নম্বর কি। অপারেটর জানতে চাইলেন কি বিষয়ক আলাপ করতে চাই, সেই অনুযায়ী নম্বর তিনি দেবেন। আমি স্পষ্ট জানালাম যে আমার একাউন্টে গোলযোগ ঘটেছে কিছু যেটা আমি বুঝতে পারছিনা, আমি চাই আমার একাউন্ট আপাতত অকার্যকরী করা হোক, পরদিন সকালে আমি আমার ব্র্যাঞ্চে গিয়ে দেখবো কি হয়েছে, তার আগে পর্যন্ত কেউ যেন এই একাউন্টে কিছুই করতে না পারে। উত্তরে অপারেটর যা জানালেন তাতে আমি আঁতকে উঠেছি। উনি জানালেন যে ফোনে এই কথা জানাতে গেলে স্থায়ী ঠিকানা না মিললে একাউন্ট অকার্যকরী করার নিয়ম নেই, সুতরাং এই ব্যাপারে কিছুই করার নেই এই মূহুর্তে, পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অগত্যা, অপেক্ষা করতেই হল। কিন্তু মনে কাঁটা খচখচ করতেই থাকলো যে আমার স্থায়ী ঠিকানার স্থানে অন্য কার কোন ঠিকানা লেখা? কিকরেই বা সেটা হল?
পরদিন সকালে ঠিক সকাল ন’টায় পৌছে গেলাম ব্যাঙ্কে। গিয়ে সব জানালাম। ব্রাঞ্চে অসুবিধা তেমন হয়নি কারন আমার হাতে অন্যান্য আইডেন্টিটি প্রমাণ ছিল। তারা জানালেন যে হ্যাঁ একটি অফিসের ঠিকানা আছে আমার একাউন্টে, তবে সেটা একাউন্ট খোলার দিন থেকেই আছে, মাঝে কেউ বদলে এইটা বসায়নি। শুনে আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম, তার মানে কি, শুরুতেই কেউ এইটা করে রেখেছে আর আমি ৩ বছরেও তা জানতে পারিনি? আমার একাউন্ট তিন বছরের (ঘটনার সময়ে)। কথাবার্তা বলে যা বুঝলাম, তা হল এইরকম —
আমার পরিচিত একজনের সূত্রে ব্যাঙ্কের এক এজেন্ট আমার কাছে এসে আমার একাউন্ট করে দিয়েছিল। নাম, ঠিকানা, ছবি ইত্যাদি সব আমার সামনেই সে লিখেছে, আমি তা দেখেছিলাম। যেহেতু আমার অস্থায়ী আর স্থায়ী ঠিকানা দুটোই এক, তাই একটাই লিখেছিল, এবং অন্যটা লিখে নেবে এই বলেছিল। আমি এতে বিশেষ কিছু সন্দেহ করিনি, অথচ গলদ ঘটিয়েছে এই এজেন্ট এইখানেই। অস্থায়ী ঠিকানা আমার আসল ঠিকানা দিয়ে স্থায়ী ঠিকানা সে দিয়েছে তার নিজের অফিসের। উদ্দেশ্য তার এমন কিছু মন্দ ছিলনা, সে তার রেফারেন্স রাখার জন্যই এইটা করেছিল, হতে পারে এজেন্টের কমিশনের চক্কর এটা। কিন্তু তার এই ছোট্ট একটি ভুল কিম্বা কমিশনের চক্করের কারনে আমি আমার নিজের একাউন্টে অজানা ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলাম। ব্যাঙ্ক আমাকেই মানছে না।
আমি এবারে ব্যাঙ্ক’কে ধরলাম। অস্থায়ী ঠিকানায় তারা চেক বই পাঠাচ্ছে, এটিএম কার্ড পাঠাচ্ছে, কার্ডের পিন পাঠাচ্ছে – সব আমার কাছে আছে, তাহলে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে তাদের এতো কড়াকড়ি কেন? উত্তর পেলাম “এটাই নিয়ম”। বাহ? তার মানে সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস অস্থায়ী ঠিকানায় পাঠাবে, সেটা নিয়ম? আর, লোক যাচাই করার বেলায় সেই অস্থায়ী ঠিকানা পাল্টে গিয়ে স্থায়ী ঠিকানা হয়ে ওঠে আসল? এ কেমন নিয়ম? উত্তর পেলাম, “এটাই এই ব্যাঙ্কের নিয়ম”। বুঝুন আপনারা তাহলে কি অবস্থা? আমার যদি ফোন ব্যাঙ্কিং করার ইচ্ছে না জাগতো তাহলে আমি আরো কতো বছর পরে গিয়ে এইটা জানতে পারতাম তার ঠিক নেই! ৩ বছরে জানতে পারিনি কারন সব ঠিকঠাক চলছিলো বলে! আমি না আটকালে কিছুই সন্দেহ করতাম না, তাইনা? কিন্তু আমার আশ্চর্যের আরো অনেক বাকি ছিল তখনো।
ব্যাঙ্কের কাছে বিনীতভাবে জানতে চাইলাম যে স্থায়ী ঠিকানা বদলাতে কি করা প্রয়োজন, কি করতে হবে আমাকে। তারা জানালেন যে পাসপোর্ট, কিম্বা ইলেক্ট্রিক বিল কিম্বা বাড়ির গ্যাস বিল, কিম্বা বাড়ির ল্যান্ডলাইন ফোনের বিলের কপি লাগবে যেটা আমার নিজস্ব নামে আছে। আমি পড়লাম মহা বিপদে। কারন, আমার পাসপোর্ট তখন গেছে রিনিউ হতে। আমার ফটোকপি থাকলেই কাছে নেই আসলটা। ওনারা ফটোকপি মানবেন না। বাকি যেসব জিনিস ওরা চাইলেন, তা সকলের নামে বাধ্যতামূলক জিনিস নয় এবং একটিও আমার নিজস্ব নামে নেই।
আমি বিয়ে হয়ে এসেছি শ্বশুড়বাড়িতে, আমার মতো যারাই বিয়ে করে শ্বশুড়বাড়ি আসে, তাদের কারো নামে কি শ্বশুড়বাড়ির ইলেক্ট্রিক বিল থাকা সম্ভব? আমি আসার আগে শ্বশুড়বাড়িতে রান্না হতো, কেউ না খেয়ে থাকতোনা, তাই গ্যাসের বিলও স্বাভাবিকভাবেই শ্বশুড়বাড়ির কারো নামেই থাকবে। আর ল্যান্ডলাইন ফোন? সেক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। আমি বারংবার অনুরোধ জানালাম তাদের কাছে, একটু বুঝে দেখার জন্য, বিশেষ করে কাউন্টারের ওপারের সবাই মেয়েরাই আছেন, তাদের এটা বোঝা উচিত ছিল যে বিবাহিতা মেয়েদের নামে চট করে শ্বশুড়বাড়ির ইলেক্ট্রিক বিল, গ্যাস বিল কিম্বা ল্যান্ডলাইন ফোন থাকেনা, অনুরোধ জানালাম যে তারা এমন কিছু চান যা সকলের নামে বাধ্যতামূলক। নাঃ, ফল হলনা, এটাই নাকি “ব্যাঙ্কের নিয়ম”। অর্থাৎ সবার নামে বাধ্যতামূলক বলতে ওনারা কেবল পাসপোর্ট চেনেন, আর কিছুই চেনেন না তারা।
অবস্থা বেশ গুরুতর বুঝতে পারলাম। আমি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি অবস্থায় আটকেছি সেটা পরিষ্কার বুঝতে পেরে কাউন্টার থেকে সরে এসে পাঁচ মিনিট বসলাম চেয়ারে। ভেবেচিন্তে মাথায় একটিই বুদ্ধি এলো আমার ওই মূহুর্তে, একাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে নেওয়াই উচিত এবং এই একাউন্ট ভুলে যাওয়াই শ্রেয় মনে করলাম। সাথে এটিএম কার্ড ছিল, ব্রাঞ্চের বাইরেই এটিএম। তুলে ফেললাম সব টাকা, এবং ব্রাঞ্চে ফিরে এসে ম্যানেজারকে চিঠি লিখলাম ওইখানে বসেই, জানিয়ে দিলাম যে এই পরিস্থিতির কারনে আমি আমার একাউন্ট আর ব্যাবহার করতে পারছিনা, এবং, আজকের পরে আমার একাউন্টে কোনো অপারেশন হলে তার জন্য আমি দায়ী থাকবোনা। একটি কপি করলাম আমার স্থানীয় পুলিশ থানায়। ব্যাঙ্কের আজব “নিয়ম” আর আমি তোয়াক্কা করবোনা।
স্রেফ নিয়মের বেড়াজালে আটকে যাওয়া আমি সকলের সামনে দিয়েই এটিএম দিয়ে সব টাকা তুলে একাউন্ট ওই অবস্থাতেই ছেড়ে দিয়ে আসলাম। তারপর থেকে ICICI Bank’এর মুখদর্শন আর করিনি। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্ক অনেক ভালো এইসব বেজায় আশ্চর্য নিয়মধারী প্রাইভেট ব্যাঙ্কের চেয়ে। ICICI Bank আমার মুখের উপরেই জানিয়েছে যে তারা ভারত সরকারের রেশন কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মানেনা, তারা এও জানিয়েছে যে তারা ভারত সরকারের ভোটার আইডি কার্ডকেও মানেনা। অথচ এইগুলো অন্যান্য সর্বত্র গ্রহণযোগ্য, শুধু এদের কাছেই নয়। কেমন করে এই প্রাইভেট ব্যাঙ্ক’কে আমি বিশ্বাস করবো আমার টাকা রেখে? যতোই নাম থাক এই ব্যাঙ্কের, তবু, আমি তো জানলাম কতোখানি কেলেঙ্কারী ভর্তি এই ব্যাঙ্ক, যদি কেউ একবার আটকায় কোনো কারনে!

টক্স said
লেখাটা খুব সময়োপযোগী হয়েছে। আমাদেরকেও এখানে এমন অনেক ঝক্কি সহ্য করতে হয়।
Rishi said
যথার্থই লিখেছেন…